সুইজারল্যান্ডের জিডিপির প্রায় দ্বিগুণ ইউবিএস ব্যাংকের ব্যালান্সশিট

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্যাংক খাতের আকার দ্রুত বাড়তে দেখা গেছে।

অনেক দেশে ব্যাংকের সম্পদের পরিমাণ এখন সে দেশের অর্থনীতির তুলনায় অনেক বড়। এতে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কারণ বড় কোনো ব্যাংক সংকটে পড়লে সেটিকে উদ্ধার করতে সরকারের বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এতে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার ওপরও চাপ পড়ে।

দ্য ন্যাশনাল নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বড় বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকের আকার এখন এতটাই বিশাল হয়ে উঠছে, কোনো সংকটে পড়লে রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষে সেগুলোকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি এ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে সুইজারল্যান্ড। দেশটির সরকার বলছে, তাদের অন্যতম প্রধান ব্যাংক ইউবিএসের আর্থিক আকার এখন রাষ্ট্রের অর্থনীতির চেয়েও বেশি। ফলে কোনো বড় বিপর্যয় ঘটলে রাষ্ট্র একা এ ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে পারবে না।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সুইজারল্যান্ড সরকার একটি নতুন পরিকল্পনা করেছে। ইউবিএস ব্যাংককে অতিরিক্ত প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার পুঁজি বা মূলধন জমা রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। ব্যাংকটি যেন যেকোনো আর্থিক ধাক্কা নিজেই সামলাতে পারে, সেজন্যই এ পদক্ষেপ।

তবে এ কড়াকড়ির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাংকটির প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সুইজারল্যান্ডে এ আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে ক্রেডিট সুইসের পতনের পর। ২০২৩ সালে বড় সংকটে পড়ে দেশটির ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক ক্রেডিট সুইস। পরে ইউবিএস সেটি অধিগ্রহণ করে। সে সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে সুইস সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শত শত বিলিয়ন ডলারের তারল্য সহায়তা ও গ্যারান্টি দিতে হয়েছিল।

বর্তমানে ইউবিএসের ব্যালান্স শিট সুইজারল্যান্ডের মোট জিডিপির প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ ব্যাংকটির আকার দেশটির পুরো অর্থনীতির তুলনায় অত্যন্ত বড়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু সুইজারল্যান্ডের সমস্যা নয়। বিশ্বের আরো অনেক দেশ একই ধরনের চাপে পড়ছে। বিশেষ করে যেসব দেশে ব্যাংক খাতের আকার দ্রুত বাড়ছে, সেখানে রাষ্ট্র ও ব্যাংক খাতের ঝুঁকি একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।

চীনের উদাহরণও এখন আলোচনায় আসছে। দেশটিতে ব্যাংক খাতের সম্পদের পরিমাণ দেশটির মোট অর্থনীতির তিন গুণেরও বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আগে বিশ্বের বড় আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে শুধু ব্যাংক ধসকে দেখা হতো। এখন ঝুঁকির বড় অংশ চলে গেছে রাষ্ট্রের আর্থিক ভারসাম্যের দিকে। কারণ বড় ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে গিয়ে সরকারের ওপর বিশাল দায় তৈরি হয়। এর আগে ছোট অর্থনীতির দেশগুলো এ বাস্তবতা দেখেছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় আইসল্যান্ডের ব্যাংকগুলোর আকার দেশটির অর্থনীতির তুলনায় অনেক বড় হয়ে যায়। পরবর্তী সময় ব্যাংকগুলো ধসে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হয়নি।

আয়ারল্যান্ডেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। ২০০৮ সালে দেশটির আর্থিক অবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন ব্যাংক খাত রাষ্ট্রের সামর্থ্যের চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখন বেসরকারি আর্থিক ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত জনগণের দায়ে পরিণত হয়।

এদিকে বিশ্বজুড়ে ব্যাংক একীভূতকরণও বাড়ছে। গত বছর বৈশ্বিক ব্যাংক খাতে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ চুক্তির পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে প্রায় ১৯ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোপে সীমান্ত পেরিয়ে ব্যাংক একীভূতকরণের হারও ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে ইউরোপেরও বড় ও শক্তিশালী ব্যাংক প্রয়োজন। তবে এখন অনেক সরকার বড় ব্যাংকের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলসহ যেসব দেশ নিজেদের আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, তাদের জন্য সুইজারল্যান্ড একটি সতর্কবার্তা। কারণ বড় সংকটে এখনো শেষ ভরসা হিসেবে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হয়। এতে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নীতিতেও পরিবর্তনের আলোচনা বাড়ছে।

আগে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেত। এখন প্রশ্ন উঠছে, সংকটে রাষ্ট্র নিজেই টিকে থাকতে পারবে কিনা।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ব্যাংক যদি একটি দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে সে ব্যাংকের জন্য মূলধন সংরক্ষণের নিয়মও কঠোর হতে হবে। তবে নিয়ম এত কঠোর করা যাবে না, যেন ব্যবসা অন্য দেশে সরে যায়। এ কারণেই ইউবিএসের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেয়ার পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছে সুইস সরকার। ব্যাংকটি বিশ্বজুড়ে ব্যবসা করলেও দেশটির অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে ঋণবাজারে এর প্রভাব অনেক বেশি। ফলে ঝুঁকিও কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

তবে সুইজারল্যান্ডের অবস্থান অন্য অনেক দেশের তুলনায় এখনো শক্তিশালী। দেশটির সরকারি ঋণ কম। মুদ্রাও শক্তিশালী। তবু বড় ব্যাংককে সামাল দেয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত মূলধন সংরক্ষণের নিয়ম চালু হলে ব্যাংকের খরচ বাড়তে পারে। এতে ঋণের সুদ ও বিভিন্ন সেবার খরচও বাড়ার আশঙ্কা আছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কিছু চাপ তৈরি হতে পারে।

কেউ কেউ ইউবিএসকে ভেঙে ছোট করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে সেটিও সহজ নয়। ব্যাংকটির সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ আলাদা করলেও মূল ঝুঁকি পুরোপুরি কমবে না। কারণ অনেক সম্পদ গ্রাহকদের হয়ে পরিচালিত হয়। আবার শুধু স্থানীয় কার্যক্রম আলাদা করলেও খরচ বাড়বে। এতে পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত সে চাপ গ্রাহকদের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুইজারল্যান্ড এখন যে সমস্যার মুখে পড়েছে, ভবিষ্যতে আরো অনেক দেশ একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। কিন্তু সংকটে সহায়তা দেয়ার দায়িত্ব এখনো জাতীয় সরকারের হাতেই রয়েছে।

আরও